হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা নিঝুম দ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন সম্ভাবনার জন্য পরিচিত এই দ্বীপের মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। একসময় জাহাজমারা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড হিসেবে থাকা নিঝুম দ্বীপকে স্বতন্ত্র ইউনিয়নে রূপান্তরের পেছনে রয়েছে প্রায় এক দশকের আন্দোলন, প্রশাসনিক তৎপরতা ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক তাজুল ইসলাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের দিকে নিঝুম দ্বীপ ছিল হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়নের অধীন একটি ওয়ার্ড। আয়তন ও জনসংখ্যার তুলনায় প্রশাসনিক কাঠামো ছোট হওয়ায় দ্বীপটির বাসিন্দাদের নাগরিক সেবা পাওয়া ছিল কঠিন। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক দূরত্বের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল এলাকাটি।
সে সময় ইউপি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাজুল ইসলাম দ্বীপের মানুষের এসব সমস্যা উপলব্ধি করেন। তিনি মনে করেন, নিঝুম দ্বীপের মানুষের নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পৃথক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি নিঝুম দ্বীপকে স্বতন্ত্র ইউনিয়ন করার দাবি তোলেন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রশাসনিক পর্যায়ে যোগাযোগের প্রচেষ্টা।
আবেদন, তদবির ও জনসম্পৃক্ততার লড়াই
তাজুল ইসলাম শুধু মৌখিক দাবি উত্থাপন করেই থেমে থাকেননি। নিঝুম দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, যোগাযোগের সংকট এবং মানুষের নাগরিক দুর্ভোগ তুলে ধরে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত লিখিত আবেদন ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের উদ্যোগ নেন। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের পাশাপাশি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংগঠিত করেন।
প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি দ্বীপের সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতেও ভূমিকা রাখেন তিনি। তাঁর আহ্বানে স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধনে অংশ নেন। ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার দাবিতে গড়ে ওঠা এ আন্দোলনে দ্বীপের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপকে পৃথক ইউনিয়নে রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার নানা জটিলতা ছিল। এসব বাধা পেরিয়ে দাবি বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যান তাজুল ইসলাম ও স্থানীয় আন্দোলনকারীরা। তাঁদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার একপর্যায়ে আসে কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত।
২০০৮ সালে স্বতন্ত্র ইউনিয়নের স্বীকৃতি
দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ২০০৮ সালে নিঝুম দ্বীপকে জাহাজমারা ইউনিয়ন থেকে পৃথক করে ১১ নম্বর নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে একটি ওয়ার্ডের পরিচয় ছাড়িয়ে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক পরিচয় পায় দ্বীপটি। স্থানীয়দের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিনের দাবি ও সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
নতুন ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়। তবে ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পরও দ্বীপটির মানুষের নানা সমস্যা রয়ে গেছে। বিশেষ করে উন্নত চিকিৎসাসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এখনো রয়েছে উন্নয়নের প্রত্যাশা
নিঝুম দ্বীপের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং পর্যটন খাতের পরিকল্পিত বিকাশের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাজুল ইসলাম বর্তমানে এসব দাবি বাস্তবায়নে কাজ করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নিঝুম দ্বীপকে স্বতন্ত্র ইউনিয়নে রূপান্তরের আন্দোলনে তাজুল ইসলামের ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁদের প্রত্যাশা, ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে উন্নয়নের পথ তৈরি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় দ্বীপের মানুষের মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে।
একটি অবহেলিত ওয়ার্ড থেকে স্বতন্ত্র ইউনিয়নে নিঝুম দ্বীপের উত্তরণ শুধু প্রশাসনিক সীমানার পরিবর্তন নয়; এটি দ্বীপের মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাজুল ইসলাম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের এক দশকের প্রচেষ্টা।
হাতিয়ার কথা