সাইফুল ইসলাম তুহিন: নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার পূর্ব চরচেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অনন্য সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। বিদ্যালয়টি থেকে মাত্র ৬ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে ২ জন ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন করে বিদ্যালয়, পরিবার এবং সমগ্র এলাকার জন্য গৌরব বয়ে এনেছে।
ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জনকারী দুই শিক্ষার্থী হলেন তাহসিন কালাম তুর্য ও আবরার ফাহাদ তামিম।
তাহসিন কালাম তুর্যের বাবা আবুল কালাম আজাদ, যিনি পলি ক্যাবলসের ফেনী শাখার ম্যানেজার। মা তারজিনা আক্তার,পূর্ব চরচেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। অন্যদিকে আবরার ফাহাদ তামিম পূর্ব চরচেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিনের ছেলে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই তাহসিন কালাম তুর্যের মনে ফলাফল নিয়ে ছিল এক নীরব প্রত্যাশা। নিজের প্রস্তুতির ওপর আত্মবিশ্বাস থাকলেও সে কখনো অহংকার করেনি। ফলাফল সম্পর্কে কেউ জানতে চাইলে সে বলত, "পরীক্ষা ভালো হয়েছে, তবে ফলাফল মহান আল্লাহর হাতে।"
অবশেষে ১২ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত ফলাফলে তার সেই বিশ্বাস বাস্তবে রূপ নেয়। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে সে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন করে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি বাবা-মা, শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের সম্মান আরও উজ্জ্বল করেছে।
বর্তমানে তাহসিন কালাম তুর্য ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং সেখানেও প্রথম স্থান অর্জন করে তার মেধা, অধ্যবসায় ও ধারাবাহিক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। তার এই কৃতিত্ব প্রমাণ করে, নিয়মিত অধ্যয়ন, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমই সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি।
তাহসিন কালাম তুর্য বলেন,
"এই অর্জনের জন্য প্রথমেই মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। আমার বাবা-মা, শিক্ষক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের দোয়া ও সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না। আমি সবসময় নিয়মিত পড়াশোনা করার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতেও আরও ভালো ফল করে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।"
তুর্যের বাবা আবুল কালাম আজাদ বলেন,
"এটি আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের দিন। সন্তানের পরিশ্রম, শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং মহান আল্লাহর অশেষ রহমতেই আজকের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। আমরা সকলের কাছে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দোয়া কামনা করছি।"
মা তারজিনা আক্তার বলেন,
"একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সব সময় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। একজন মা হিসেবে নিজের সন্তানকেও একই আদর্শে গড়ে তুলতে চেয়েছি। আজ তার এই অর্জনে আমি মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। আমি চাই সে একজন আদর্শ মানুষ হয়ে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করুক।"
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন বলেন,
"আমাদের বিদ্যালয় থেকে মাত্র ৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্যে ২ জনের ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এটি শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং অভিভাবকদের সহযোগিতার ফল। আবরার ফাহাদ তামিম আমার ছেলে হলেও তার এই অর্জন সম্পূর্ণ নিজের মেধা ও পরিশ্রমের ফল। বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী আমার নিজের সন্তানের মতো। তাদের প্রতিটি সাফল্যই আমাদের অনুপ্রেরণা।"
উল্লেখ্য, ১২ জুলাই ২০২৬ প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, হাতিয়া উপজেলায় মোট ৮৬ জন শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন করেছে, যার মধ্যে ৪ জন বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এছাড়া সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে ৬১ জন, যার মধ্যে ১০ জন বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রয়েছে।
হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও অনেক বিদ্যালয় প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় পূর্ব চরচেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সাফল্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
শিক্ষাবিদরা জানান, নিয়মিত অধ্যবসায়, দক্ষ শিক্ষক, সচেতন অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীর দৃঢ় মনোবল থাকলে যেকোনো সীমাবদ্ধতাকে জয় করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। পূর্ব চরচেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জন সেই সত্যেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হাতিয়ার কথা