আবিদ উল্যাহ জাকের:
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের যেসব আসন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তার শীর্ষেই উঠে আসছে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের নাম। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, চরাঞ্চলের আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্রধারী ডাকাত ও প্রভাবশালী গ্রুপের সক্রিয়তা এবং অতীতের সহিংস নির্বাচনী ইতিহাস—সব মিলিয়ে হাতিয়ার ভোটকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয় মানুষ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মধ্যে।
হাতিয়া একটি দ্বীপ উপজেলা। নৌপথ ছাড়া যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। উপজেলার অন্তর্ভুক্ত নিঝুম দ্বীপ, ঢাল চর, চর মোহাম্মদ আলী, চর ইউনুস, চর আউয়াল, মৌলভীর চর, চর ঈশ্বর, চর জাবেদ, চর গাজারিয়া ও গাঙ্গুরিয়ার চর দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব চরে অস্ত্রসহ সক্রিয় ডাকাত ও প্রভাবশালী সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে, যারা ভোট এলেই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো এবং ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ নতুন নয়।
সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলো এই শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৩ ডিসেম্বর চর দখলকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা হাতিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। স্থানীয়দের মতে, এসব সংঘর্ষ শুধু ভূমি দখলের বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ছে।
রাজনৈতিক দিক থেকেও নোয়াখালী-৬ আসনে উত্তেজনা তুঙ্গে। বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম। অপরদিকে ১০ দলীয় জোটের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ। এ ছাড়া জাতীয় পার্টিসহ একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। প্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে এবং ইতোমধ্যে একাধিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
হাতিয়ার নির্বাচনী ইতিহাসও সাধারণ ভোটারদের ভরসা জোগায় না। বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট কেন্দ্র দখল, বিরোধী দলের সমর্থকদের ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, নির্দিষ্ট প্রার্থী ছাড়া অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে হুমকি দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের ভোট কেন্দ্রগুলোতে এসব অনিয়মের অভিযোগ বেশি ছিল। অনেক ভোটার জানান, ভয় ও আতঙ্কের কারণে তাঁরা ভোট দিতে যেতে পারেননি বা ভোট দিয়েও নিরাপদে ফিরতে পারেননি।
ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হাতিয়া বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানো কঠিন। খারাপ আবহাওয়া বা সহিংস পরিস্থিতিতে নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে ছোট একটি ঘটনাও দ্রুত বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, চরাঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, স্থানীয় প্রভাবশালী গ্রুপগুলোর আধিপত্য, রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা হাতিয়াকে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোর একটি করে তুলেছে। এসব কারণে এখানে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াখালী-৬ আসনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে ভোটের দিন নয়, বরং অনেক আগ থেকেই বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ চরগুলোতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, নৌপথে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং ভোট কেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই ঝুঁকিপূর্ণ দ্বীপে যদি শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করা না যায়, তবে তার প্রভাব পড়বে জাতীয় রাজনীতিতেও।
হাতিয়ার কথা