-মুহাম্মদ কেফায়েতুল্লাহ
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের খবরে যখন পুরো দেশ শোকে মূহ্যমান, ঠিক তখনই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই হুমকির ভাষা ও ভঙ্গি হাতিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশকে নতুন করে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—হাদি হত্যার পর পরই হান্নান মাসউদের প্রতি এই প্রকাশ্য হুমকি কি কাকতালীয়, নাকি এটি ধারাবাহিক কোনো প্রবণতার অংশ?
জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির অন্যতম যোদ্ধা হান্নান মাসউদ। প্রথম সারির ৬ সমন্বয়ক যখন ডিবি হেফাজতে, তখন নেতৃত্বশুন্য যুদ্ধের ময়দানে স্বোচ্ছার কণ্ঠে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে উজ্জীবিত করেন হান্নান মাসউদ। তার এ ঘোষনাটিই আজকের ২য় স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছে। ওই সময় থেকেই তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্বে যুক্ত হয়ে তিনি নিজ এলাকায় রাজনীতি শুরু করেন।
হাতিয়ার মতো এলাকায় নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সবসময় সহজভাবে নেওয়া হয় না—এ বাস্তবতা নতুন নয়। হান্নান মাসউদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
হান্নান মাসউদ স্থানীয় রাজনীতিতে সরাসরি প্রচলিত বলয়ের বাইরে অবস্থান নিয়ে মাঠে নামেন। নির্বাচনী প্রচারণা, সভা-সমাবেশ ও জনসংযোগের মাধ্যমে তিনি সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। এতে একদিকে তরুণ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে, অন্যদিকে বিরোধিতাও স্পষ্ট হয়।
গত কয়েক মাসে তার কর্মসূচিতে বাধা, সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধ এবং উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে—যা হাতিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক হুমকির ঘটনাটি আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া হুমকিতে যেসব শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক বক্তব্যের সীমা অতিক্রম করেছে। এটি সরাসরি প্রাণনাশের ইঙ্গিত বহন করে। হুমকিদাতারা নিজেদের পরিচয় গোপন না রেখে প্রকাশ্যে কথা বলেছে—যা আরও উদ্বেগজনক।
এর আগে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে মানুষ এখনো হতবাক। সেই ঘটনার বিচার ও অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে হান্নান মাসউদের প্রতি হুমকি স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এসব আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবতা হলো—হাতিয়ার মানুষ এখন আর শুধু আশ্বাসে ভরসা রাখতে চায় না।
হুমকিদাতাদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা।রাজনৈতিক মতভেদে সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ। নির্বাচনী পরিবেশে সব প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান না হলে আশঙ্কা থেকেই যাবে।
এই লেখাটি কোনো ব্যক্তিকে অকারণে বড় করে দেখানোর জন্য নয়। প্রশ্নটি হান্নান মাসউদকে ঘিরে উঠলেও বিষয়টি আসলে হাতিয়ার সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে।
যদি একজন প্রার্থী প্রকাশ্যে হুমকি পান, আজ তিনি—কাল অন্য কেউ। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ।
হাতিয়া সহিংস রাজনীতি আর চায় না—এটি এখন সাধারণ মানুষের স্পষ্ট দাবি।
শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং হান্নান মাসউদকে দেওয়া হুমকি একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ধরে নিলে ভুল হবে।
জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধারা এ জাতির অমূল্য সম্পদ এবং দেশবিরোধী চক্রের চোখের বালি। ওসমান হাদী হত্যার পরও জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র কেন কার্পন্য করছে তা বুঝে আসছেনা। অচিরেই তাদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায়না।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক হাতিয়ার কথা
Hatiyar Kotha