ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এক হাতের তালুতে রাখা সেই শিশুই আজ শিবিরের সাথী, স্মৃতিচারণে মা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
এক হাতের তালুতে রাখা সেই শিশুই আজ শিবিরের সাথী, স্মৃতিচারণে মা ছবির ক্যাপশন: বাবা সাব্বির আহমেদ এর সাথে তাসবির
ad728

মাত্র ১ কেজি ৪৮ গ্রাম ওজন। চোখ ফোটেনি। এক হাতের তালুর ওপর রাখা যেত। অক্সিজেন ছাড়া এক মিনিটও বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো, লাইফ সাপোর্ট, ১৮ দিন ইনকিউবেটরে জীবন-মৃত্যুর লড়াই—সব পেরিয়ে সেই শিশুই আজ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী হিসেবে শপথ নিয়েছে। ছেলের এই নতুন পথচলায় আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন মা মাহমুদা লাকি। শিশুটির বাবা সাব্বির আহমেদ তাফসির নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভা মেয়র পদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী।

নিজের ফেসবুক পোস্টে ছেলের শৈশবের কঠিন সময়ের স্মৃতিচারণ করে মাহমুদা লাকি জানান, দ্বিতীয়বার মা হওয়ার খবর যখন জানতে পারেন, তখন গর্ভের সন্তানটির বয়স ইতোমধ্যে পাঁচ মাস। এর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে পৃথিবীর আলো দেখে শিশুটি। তখন তার বড় ছেলের বয়স ছিল মাত্র ১৩ মাস।

জন্মের সময় শিশুটির বয়স সাত মাসও পূর্ণ হয়নি। ওজন ছিল মাত্র ১ কেজি ৪৮ গ্রাম। চোখও তখন পুরোপুরি ফোটেনি। শরীর এতটাই ছোট ছিল যে এক হাতের তালুর ওপর রাখা যেত তাকে।

এদিকে সন্তান জন্মের সময় মায়ের নিজের শারীরিক অবস্থাও ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তার হিমোগ্লোবিন নেমে গিয়েছিল ৫ থেকে ৬-এ। ফলে পরিবারের সদস্যরা শিশুটির প্রকৃত অবস্থা তার কাছ থেকে গোপন রাখেন। শুধু বড় ফুপি ও নানির কান্না দেখে তিনি বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়।

পরে জানতে পারেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনআইসিইউতে জায়গা না থাকায় তার শিশুকে রিলিজ করে দেওয়া হয়েছে। আর অক্সিজেন ছাড়া শিশুটি এক মিনিটও বাঁচতে পারবে না।

সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে মাহমুদা লাকি লেখেন, তিনি শুধু নিজের বাবা‘আব্বা, আমার ছেলের জন্য দোয়া করো। তার মনে হতো, বাবার দোয়া পেলেই হয়তো সন্তানটি বেঁচে যাবে।

এরপর শুরু হয় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে চলা। নানির কোলে নবজাতক, আর পরিবারের সদস্যরা অক্সিজেনের বোতল টেনে নিয়ে ছুটছেন। একপর্যায়ে অক্সিজেনের অভাবে শিশুটির শরীর নীল হয়ে যায়।

ঢাকা পিজি হাসপাতালেও তাকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। সেখান থেকে শংকর ইবনে সিনায় নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে শিশুটির বাবা সাব্বির আহমেদ তাফসিরের পরিচয়ে তাকে ভর্তি করানো সম্ভব হয়।

তবে চিকিৎসকদের কথায় তখনও স্বস্তির কোনো কারণ ছিল না। জানিয়ে দেওয়া হয়, শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হবে; সকাল পর্যন্ত সে বেঁচে নাও থাকতে পারে।

সেই রাতের কথা ছিল পরিবারের জন্য এক দুর্বিষহ সময়। শিশুটিকে হাসপাতালে রেখে সবাই বাসায় ফিরে আসেন। বড় ভাই, মা, শিশুটির বাবা, ফুপি—কেউ কাউকে সান্ত্বনা দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না। প্রত্যেকেই যেন নিজের জন্য সান্ত্বনা খুঁজছিলেন।

কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে সেই রাত পার করে শিশুটি। এরপর টানা ১৮ দিন ইনকিউবেটরে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে সুস্থ হয়ে ওঠে।

এই জীবনযুদ্ধের সঙ্গে ছিল চিকিৎসার বিপুল ব্যয়। মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি রাতে প্রায় ৫৬ হাজার টাকা খরচ হতো। পরিবারের আর্থিক অবস্থা তখন এমন ছিল না যে এত বড় ব্যয় সহজে বহন করা সম্ভব। তবুও কোনো না কোনোভাবে অর্থের ব্যবস্থা হয়ে যেত।

শিশুটির মেজ চাচু, বড় মামা, নানা, বাবার অগ্রিম বেতন এবং মায়ের মেডিকেল সহকর্মীরা এ সময়ে পাশে দাঁড়ান। বিশেষভাবে ফাহমিদা রিয়াজ, তাহমিনা সাইফুন, মরিয়ম নেছা মমি, মাহবুবা মাহি, শিরিন আলী ও মারজান মনি মুক্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মাহমুদা লাকি।

হাসপাতালের সেই অধ্যায় শেষ হলেও শিশুটির জীবনযুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। বাড়িতে ফেরার পর দুর্বল শিশুটিকে কয়লার আগুনের উষ্ণতার পাশে রাখা হতো। তার নানি সারাদিন তাকে নিজের কাছে রাখতেন।

ধীরে ধীরে শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে। তবে মায়ের ভয় কাটেনি। সামান্য অসুস্থ হলেই তিনি বারবার সন্তানের নাকে ও বুকে হাত দিয়ে দেখতেন—সে ঠিকমতো শ্বাস নিচ্ছে তো? বেঁচে আছে তো?

শৈশবজুড়ে ছিল নিউমোনিয়ার আতঙ্ক। শীত আসার আগেই সন্তানের জন্য শুরু হতো বাড়তি প্রস্তুতি।

সেই দুর্বল শিশুটিই আজ বড় হয়েছে। মায়ের ভাষায়, এখনো তাকে বড় মনে হয় না। প্লেটে কম খাবার দেন—কারণ হাতে ভ‘চশমাওয়ালা পাখির ছানা’।

আর সেই পাখির ছানাই এবার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী হিসেবে শপথ নিয়েছে।

ছেলের সাথী শপথের খবর শুনে তার নানা কেঁদেছেন, দোয়া করেছেন। আর মা মাহমুদা লাকি বলছেন, তিনি শুধু মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছেন। অন্যদিকে বাবা সাব্বির আহমেদ তাফসির যেন এই অর্জনে পৃথিবী জয় করার আনন্দ অনুভব করছেন।

সন্তানের জন্য মায়ের প্রার্থনা—আল্লাহ যেন তার ‘চশমাওয়ালা পাখির ছানা’কে কবুল করেন, তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করেন।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : হাতিয়ার কথা

কমেন্ট বক্স
নেতাকর্মীদের নিয়ে জামায়াতে যোগ দিলেন সাবেক এমপি

নেতাকর্মীদের নিয়ে জামায়াতে যোগ দিলেন সাবেক এমপি