প্রিন্ট এর তারিখঃ ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ || প্রকাশের তারিখঃ ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আবিদ উল্যাহ জাকের
হাতিয়ার ১২২ জন এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ঢাকায় এনে জাতীয় সংসদ ভবন পরিদর্শনের সুযোগ করে দিয়েছে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুল হান্নান মাসউদ। একজন জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
শুধু সংসদ ভবন ঘুরিয়ে দেখানো নয়, হাতিয়ার মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হতে পারে তাদের জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। দেশের আইনসভা, রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ তাদের চিন্তা ও স্বপ্নকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
একসময় আমরাও জিপিএ-৫ পেয়েছি। তখন ভালো ফলাফল করার আনন্দ ছিল, গর্ব ছিল; কিন্তু এর বাইরে এমন কোনো সুযোগের কথা কল্পনাও করিনি। হাতিয়ার একজন শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করবে, এরপর তাকে ঢাকায় এনে জাতীয় সংসদ ভবনসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো দেখানো হবে এমন উদ্যোগ তখন আমাদের জীবনের অংশ ছিল না।
অনেকেরই মনে হয়েছে, হাতিয়ার শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করলেও তাদের অর্জনকে যথাযথভাবে উদযাপন কিংবা উৎসাহিত করার উদ্যোগ ছিল সীমিত। সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীর সময়ে হাতিয়ার মানুষের নানা সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার যে অভিযোগ বা যতটুকু স্বচক্ষে দেখেছি এই প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেটিও তুলনা করে দেখা স্বাভাবিক।
আমার নিজেরও ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ঘটনার পর জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশের সুযোগ হয়েছিল। গণভবন ও সংসদ ভবনে প্রবেশকারী প্রথম কয়েকজনের মধ্যে থাকার সেই মুহূর্তের অনুভূতি আজও ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এখন তো পাস কার্ড আছে চাইলেই যেকোনো সময় যেতে পারি।
একটি প্রতিষ্ঠানের দরজা মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার অনুভূতি এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই আলাদা।
আজ হাতিয়ার ১২২ জন শিক্ষার্থী সেই অভিজ্ঞতার সুযোগ পাচ্ছে, এটি তাদের স্বপ্নের পরিধি বড় করার একটি সুযোগ।
আজ যারা সংসদ ভবনের ভেতরে গিয়েছে, তাদের কেউ হয়তো ভবিষ্যতে চিকিৎসক হবে, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ প্রশাসনে যাবে, কেউ সাংবাদিক হবে, আবার কেউ হয়তো একদিন নিজেই জনপ্রতিনিধি হবে। তারা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হবে, আদৌ কোনো রাজনীতিতে যাবে কি না তা সময়ই বলবে।
কিন্তু একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত তাদের মনে রাষ্ট্র, সংসদ ও জনপ্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে একটি প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরি হয়েছে। তারা বুঝতে পারবে, হাতিয়ার মতো প্রত্যন্ত দ্বীপ থেকেও দেশের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জন্য অচেনা নয়। তাদেরও সেখানে যাওয়ার অধিকার আছে, স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। এই জায়গাটিই হান্নান মাসউদের উদ্যোগটির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক।
তবে এর সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও মনে রাখা জরুরি।
১২২ জন শিক্ষার্থীকে এমন একটি সারপ্রাইজ দেওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু একজন সংসদ সদস্যকে মানুষ শুধু এমন কিছু ব্যতিক্রমী আয়োজন করার জন্য নির্বাচিত করেন নাই। জনপ্রতিনিধির প্রতি মানুষের প্রত্যাশা আরও বড়। হাতিয়ার মানুষ ভোট দিয়ে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন তাদের দীর্ঘদিনের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানের আশায়।
হাতিয়ার মানুষ চায় উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযাতায়াত, নদীভাঙন থেকে বসতবাড়ি ও ফসলি জমির সুরক্ষা, কার্যকর বেড়িবাঁধ, উন্নত চিকিৎসাসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষি ও মৎস্য খাতের উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সেবায় সহজ প্রবেশাধিকার।
দ্বীপের মানুষের এসব প্রত্যাশা পূরণই সংসদ সদস্য হিসেবে হান্নান মাসউদের দায়িত্ব।
হান্নান মাসউদকে ঘিরে হাতিয়ার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি, তার প্রতি সমর্থন শুধু রাজনৈতিক সমীকরণের ফল নয়; অনেক সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে গিয়ে তার জন্য দোয়া করেছেন। এমন মানুষও আছেন, যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হয়েও কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই তার জন্য দোয়া করেছেন, যেন তার মাধ্যমে হাতিয়ার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান হয়, যেন অতীতের বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
এই আস্থা হান্নান মাসউদের জন্য যেমন বড় শক্তি, তেমনি বড় দায়িত্বও।
রাজনীতিতে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, জনবল আর জনসমর্থন এক জিনিস নয়।
দল ভারী করা, চারপাশে অনেক মানুষ জড়ো করা কিংবা পদ-পদবি দিয়ে অনুসারী বাড়ানোর চেয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো অনেক বেশি কার্যকর। হান্নান মাসউদ যদি মানুষের বিপদে পাশে থাকেন, মানুষের কথা শোনেন এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখেন, তাহলে তার জন্য আলাদা করে জনবল তৈরির প্রয়োজন হয় না। মানুষের ভালোবাসাই ধীরে ধীরে তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, কেবল দলীয় লোকজন বাড়ানোর চেষ্টা করলে সেই বলয় সবসময় টেকসই নাও হতে পারে। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে ক্ষমতার সময় পাশে থাকা মানুষই পরবর্তীতে সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হান্নান মাসউদ যে রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল বা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে কোনো দলের বর্তমান ভোটের হিসাবই যে ভবিষ্যতের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজনীতি পরিবর্তনশীল।
আজ যে দল ছোট, আগামী দিনে সেটি বড় হতে পারে; আবার বড় দলও সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তাই এমপি মহোদয়ের সবচেয়ে নিরাপদ রাজনৈতিক বিনিয়োগ হওয়া উচিত জনগণ।
১২২ জন শিক্ষার্থীকে সংসদ ভবন দেখানোর উদ্যোগ শুধু একটি দিনের আয়োজন হিসেবে না দেখে বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখা দরকার।
আজ যারা হাতিয়া থেকে ঢাকায় এসেছে, তারা আগামী দিনের হাতিয়ার সম্ভাবনা। তাদের মধ্যে কেউ হয়তো একদিন হাতিয়ার উন্নয়নের পরিকল্পনা করবে, কেউ প্রশাসনে সিদ্ধান্ত নেবে, কেউ জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবে।
হাতিয়ার পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত বাইরের কেউ এসে করবে না। হাতিয়ার সন্তানদেরই সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে হবে।
সেই জায়গা থেকে একজন সংসদ সদস্য হিসেবে হান্নান এরই দায়িত্ব এই প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানো, তাদের সামনে সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া এবং একই সঙ্গে হাতিয়ার বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করা।
এমপি মহোদয়ের মনে রাখা উচিত, মানুষ সবসময় জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে বড় বড় রাজনৈতিক বক্তব্য চায় না। তারা চায় কাজ। তারা চায়, সন্তান অসুস্থ হলে ভালো চিকিৎসা পাক। নদীভাঙনে ঘর হারালে নিরাপদ আশ্রয় পাক। ঢাকায় যেতে হলে নিরাপদ ও ন্যায্য নৌযাতায়াত পাক। শিক্ষার্থীরা ভালো শিক্ষা পাক। তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাক। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাক।
এসব মৌলিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেই আপনার চারপাশে সত্যিকারের জনবল তৈরি হবে।
হান্নান মাসউদের সামনে এখন বড় সুযোগ। ১২২ জন শিক্ষার্থীকে সংসদ ভবন দেখানোর মতো উদ্যোগ মানুষের মনে ইতিবাচক বার্তা তৈরি করেছে। এই ইতিবাচকতাকে আরও বড় আস্থায় রূপ দিতে হলে তাকে হাতিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও মৌলিক সমস্যার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে।
কারণ আমরা তাকে আমাদের প্রত্যাশার একটি অংশও তুলে দিয়েছি।
এই প্রত্যাশা পূরণ হলে মানুষই তার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে। আর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে কোনো রাজনৈতিক বলয়, পদ-পদবি কিংবা কৃত্রিম জনবল সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। (হুমকি)
১২২ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংসদে নেয়া এই ছোট ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি হান্নান মাসউদ কতটা আন্তরিকভাবে হাতিয়ার বড় সমস্যাগুলোর সমাধানে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন সেটা দেখতে চাই।